বাংলাদেশে টিকাদান ব্যাহত হওয়ায় হামের ভয়াবহ বিস্তার, বিশ্বজুড়ে সতর্কবার্তা প্রকাশিত: ৮:০২ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ১৭, ২০২৬ টিকা কর্মসূচির সুবাদে দীর্ঘ সময় ধরে সংক্রামক ব্যাধি হাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম হলেও সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রভাবে বাংলাদেশে বড় ধাক্কা খেয়েছে এই সাফল্য। প্রয়োজনীয় টিকা থেকে বঞ্চিত হওয়ায় দেশের হাজার হাজার শিশু এখন ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ হামের প্রাদুর্ভাবের মুখোমুখি। একই সঙ্গে দুর্বল তথ্য ব্যবস্থাপনা, মাঠপর্যায়ে প্রচারণার ঘাটতি এবং টিকাদানের নির্ধারিত লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থতার কারণে এই সংকট জটিল আকার ধারণ করেছে। টিকাদানের কভারেজ কমে গেলে কেমন জনস্বাস্থ্য বিপর্যয় ঘটতে পারে, বিশ্ববাসীর জন্য বাংলাদেশ এখন সেই বাস্তবতার বড় সতর্কবার্তা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) দেওয়া তথ্যমতে, চলতি বছরের মার্চের মাঝামাঝি সময় থেকে ৯ই অক্টোবর পর্যন্ত বাংলাদেশে ২ লাখ ২ হাজার সন্দেহভাজন হামের রোগী শনাক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে ২২ হাজার রোগীর শরীরে ভাইরাসের উপস্থিতির নিশ্চিত প্রমাণ মিলেছে। বিশ্বজুড়ে এ বছর সন্দেহভাজন হামের রোগীর হিসাবে এটিই সর্বোচ্চ সংখ্যা। অতি সংক্রামক এই ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে এ পর্যন্ত ১ হাজার ১৪৭ জনের মৃত্যু ঘটেছে, যার ৯৪ শতাংশই পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা জানান, যেকোনো দেশে মহামারি ঠেকিয়ে রাখতে হলে অন্তত ৯৫ শতাংশ টিকাদান কভারেজ প্রয়োজন হয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশ এই লক্ষ্যমাত্রার কাছাকাছি পৌঁছাতে পারলেও ২০২৫ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও অস্থিরতার জেরে সেই স্বাভাবিক টিকাদান প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়। ডব্লিউএইচও এবং ইউনিসেফের যৌথ প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০২৫ সালে দেশে প্রথম ডোজের কভারেজ নেমে আসে ৯০ শতাংশে এবং দ্বিতীয় ডোজের কভারেজ দাঁড়ায় ৮৬ শতাংশে। তা ছাড়া স্বাস্থ্যকর্মীদের কর্মবিরতি, বিদেশ থেকে টিকা আমদানিতে বিলম্ব এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলে তদারকির অভাবে সামগ্রিক টিকাদান কার্যক্রমে বড় ধরনের শূন্যতা তৈরি হয়। সংকটজনক এই পরিস্থিতি নিয়ে সতর্ক করে নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্লোবাল পাবলিক হেলথ স্কুলের অধ্যাপক এবং ডব্লিউএইচওর টিকা উপদেষ্টা মার্ক জিৎ জানান, যেকোনো দেশের জন্যই এটি একটি চরম সতর্কবার্তা। তিনি জোর দিয়ে বলেন, জরুরি ভিত্তিতে মহামারি মোকাবিলা করার চেয়ে নিয়মিত কর্মসূচির মাধ্যমে টিকাদান নিশ্চিত করে রোগ প্রতিরোধ করা অনেক বেশি সহজ, সাশ্রয়ী ও নিরাপদ। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে সরকারের জরুরি টিকাদান কার্যক্রমের মারাত্মক ত্রুটি ও প্রস্তুতির ঘাটতির চিত্র। প্রতিবেদনে জানা যায়, এপ্রিল মাসে প্রায় ২ কোটি শিশুকে টিকা দিয়ে সব শিশুকে এর আওতায় আনার দাবি করেছিল সরকার। কিন্তু জুন মাসে অপর এক স্বাস্থ্য কার্যক্রমে দেখা যায়, একই বয়সী প্রায় ৪০ লাখ শিশু কোনো ধরনের তালিকার মধ্যেই ছিল না। সাধারণ সময়ে টিকাদান অভিযানের পূর্বে চার ধাপে প্রস্তুতি যাচাই করা হলেও সময়স্বল্পতার অজুহাতে মাত্র এক ধাপে তা শেষ করা হয়। ফলে টিকাদান কার্যক্রমের পূর্বে আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে ৮২ শতাংশ যেমন টিকাহীন ছিল, অভিযানের পরও সেই হার ৮৫ শতাংশে অপরিবর্তিত থাকে। পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার বিষয়ে সেপ্টেম্বর মাসে রয়টার্সকে দেওয়া এক বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের স্বাস্থ্য বিষয়ক বিশেষ সহকারী জিয়াউদ্দিন হায়দার জানান, প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে সরকার সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তবে অভিভাবকদের অনীহা কিংবা শিশুদের অসুস্থতার কারণে কিছু শিশু টিকার আওতা থেকে বাদ পড়ে থাকতে পারে। চলমান প্রাদুর্ভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় সিলেট বিভাগ। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সেখানে অন্তত ১৮০ শিশুর প্রাণহানি ঘটেছে। স্থানীয় ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর অভিযোগ, গ্রামে কোনো স্বাস্থ্যকর্মী সময়মতো টিকা দিতে আসেননি; বরং শিশুর মৃত্যুর পরই কেবল স্বাস্থ্য বিভাগের লোকজন উপস্থিত হয়েছেন। অন্যদিকে, গত সেপ্টেম্বর মাসে দেশে প্রতিদিন গড়ে ১ হাজার ১৯৮ জন নতুন হামের রোগী পাওয়া গেছে। একই সময়ে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব চলায় হাসপাতালগুলোতে শয্যা সংকট চরম রূপ নিয়েছে। সিলেটের ১০০ শয্যাবিশিষ্ট শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালে ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত রোগী ভর্তি রেখে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। মোট আক্রান্তের এক-তৃতীয়াংশই পাঁচ বছরের বেশি বয়সী হওয়ায় বিশেষজ্ঞরা এখন এই বয়সের ঊর্ধ্বের শিশুদেরও টিকার আওতায় আনার পরামর্শ দিয়েছেন। সাধারণত ছয় মাসের কম বয়সী শিশুরা মাতৃগর্ভ থেকে পাওয়া অ্যান্টিবডি দ্বারা সুরক্ষিত থাকলেও, বর্তমান পরিস্থিতিতে কেন এই শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দ্রুত কমে যাচ্ছে, তা নিয়ে গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন চিকিৎসকরা। SHARES স্বাস্থ্য বিষয়: জনস্বাস্থ্যটিকাদান কর্মসূচিবিশ্ব-স্বাস্থ্য-সংস্থাসিলেট স্বাস্থ্য সংবাদস্বাস্থ্য সংকটহামের প্রাদুর্ভাব