ছাত্র আন্দোলনের মুখে ভারতের শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ

প্রকাশিত: 6:02 PM, July 25, 2026

ভারতের কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান অবশেষে পদত্যাগ করেছেন। বহুল আলোচিত ন্যাশনাল এলিজিবিলিটি কাম এন্ট্রান্স টেস্ট (নিট) পরীক্ষার প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ, শিক্ষা ব্যবস্থায় অনিয়ম এবং জবাবদিহির দাবিতে চলমান তীব্র ছাত্র আন্দোলনের মুখে তিনি এই সিদ্ধান্ত নেন। শনিবার (২৫ জুলাই) প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির কাছে তিনি নিজের পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন।

পদত্যাগের বিষয়ে ধর্মেন্দ্র প্রধান জানান, বিগত ১০ দিনের ঘটনাপ্রবাহ তাকে গভীরভাবে ব্যথিত করেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) প্রকাশিত পদত্যাগপত্রে তিনি উল্লেখ করেন, বিষয়টি কোনো ব্যক্তিগত সম্মান বা ভাবমূর্তির নয়; বরং এটি দেশের শিক্ষার্থী ও তরুণদের স্বার্থ রক্ষার প্রশ্ন। ভারতের গণতন্ত্রের শক্তি এবং তরুণদের স্বপ্ন ও আকাঙ্ক্ষার প্রতি নিজের অটল বিশ্বাসের কথা জানিয়ে বিদায়ী এই মন্ত্রী বলেন, তরুণরাই দেশের ভবিষ্যৎ এবং একটি উন্নত ভারতের নির্মাতা। দেশের তরুণ সমাজ যাতে কোনো বিভ্রান্তির জালে আটকে না পড়ে, সেই বিবেচনা থেকেই তিনি পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

দিল্লির যন্তর-মন্তরসহ ভারতের বিভিন্ন স্থানে চলমান আন্দোলনের প্রসঙ্গ টেনে ধর্মেন্দ্র প্রধান তার চিঠিতে আশঙ্কা প্রকাশ করেন, পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে কোনো রাষ্ট্রবিরোধী শক্তি যেন বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে না পারে। দেশের ঐক্য অক্ষুণ্ন রাখার পাশাপাশি কোনো শিক্ষার্থী যাতে আইনি জটিলতায় না জড়ায়, সেটি নিশ্চিত করতেই তিনি প্রধানমন্ত্রীর কাছে পদত্যাগপত্র পাঠিয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার সহকর্মী এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। ওডিশার এই রাজনীতিক জানান, দেশের সেবা করাই সবসময় তার জীবনের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার ছিল এবং ভবিষ্যতেও তিনি ওডিশার জনগণ ও দেশের তরুণদের কল্যাণে কাজ করে যাবেন।

ভারতে মেডিকেল কলেজে স্নাতক পর্যায়ের ভর্তি পরীক্ষা ‘নিট’-এ প্রশ্নফাঁস ও বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ ওঠার পর দেশজুড়ে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। এই অনিয়মের তদন্তে কেন্দ্রীয় সংস্থাগুলো কাজ শুরু করে এবং বিষয়টি আদালতের নজরেও আসে। এই পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে গত জুনের শুরু থেকে ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) নেতৃত্বে আন্দোলন শুরু হয়। গত ২০ জুলাই এই আন্দোলন আরও বড় আকার ধারণ করে, যখন হাজার হাজার শিক্ষার্থী ও তরুণ পেশাজীবী দিল্লির যন্তর মন্তরে সমবেত হয়ে সংসদ অভিমুখে পদযাত্রার ঘোষণা দেন।

আন্দোলনের আয়োজকদের দাবি, সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে এটি ছিল অন্যতম বড় ছাত্র-যুব আন্দোলন। শিক্ষা ব্যবস্থায় জবাবদিহি নিশ্চিত করা, নিট পরীক্ষায় অনিয়মের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা এবং শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে এই আন্দোলন দিল্লির বাইরে মুম্বাইসহ ভারতের বিভিন্ন শহরে ছড়িয়ে পড়ে। বিক্ষোভ চলাকালে কয়েকটি স্থানে পুলিশ ও আন্দোলনকারীদের মধ্যে সংঘর্ষ ও আটকের ঘটনাও ঘটে। তবে সিজেপি নেতারা শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান। এই আন্দোলনে নতুন মাত্রা যোগ করেন বিশিষ্ট শিক্ষা সংস্কারক সোনম ওয়াংচুক। শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সংহতি জানিয়ে তিনি অনির্দিষ্টকালের অনশন শুরু করেন। পরবর্তীতে তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয় এবং অনশন ভাঙার আহ্বান দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।

আন্দোলন তীব্র হওয়ার সাথে সাথে ভারতের বিভিন্ন বিরোধী রাজনৈতিক দলও এতে সমর্থন জানায়। তবে সিজেপির দাবি, তাদের এই আন্দোলন শুধু নিট পরীক্ষার অনিয়মের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং তরুণদের বিভিন্ন সমস্যার কার্যকর সমাধানের বৃহত্তর দাবির অংশ। এর আগে গত ২১ জুলাই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সরকারি পরীক্ষার পবিত্রতা নষ্টকারীদের বিরুদ্ধে ‘সবচেয়ে কঠোর শাস্তি’ নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। জাতীয় গণতান্ত্রিক জোট (এনডিএ) সংসদীয় দলের বৈঠকের পর কেন্দ্রীয় মন্ত্রী কিরেন রিজিজু প্রধানমন্ত্রীর এই কঠোর বার্তা গণমাধ্যমের সামনে তুলে ধরেছিলেন, যেখানে শিক্ষার্থীদের আশ্বস্ত করে বলা হয়েছিল যে দায়ীদের বিচারের আওতায় আনতে সরকার সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে। কেন্দ্রীয় সরকার আরও জানায়, নিট পরীক্ষার অনিয়মের অভিযোগের তদন্ত চলমান রয়েছে এবং দোষীদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।