আশুগঞ্জ পাওয়ার স্টেশনে তিন বছরে ৯৬৯৭ কোটি টাকার অনিয়ম প্রকাশিত: ৯:৩৬ পূর্বাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ১৩, ২০২৬ সরকারি মালিকানাধীন আশুগঞ্জ পাওয়ার স্টেশন কোম্পানি লিমিটেডের (এপিএসসিএল) গত তিন অর্থবছরের হিসাব নিরীক্ষায় ৯ হাজার ৬৯৭ কোটি ৫০ লাখ ৭০ হাজার ৪৩৫ টাকার বিশাল অংকের অনিয়মের তথ্য বেরিয়ে এসেছে। দেশের সবচেয়ে বড় এই পাওয়ার হাবের ৬টি ইউনিটের মাধ্যমে ১৬৪৭ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়। গত বছরের ২৪শে আগস্ট থেকে ২৫শে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত পরিচালিত কমপ্লায়েন্স অডিট শেষে এ বছরের ১৪ই জানুয়ারি বিদ্যুৎ ও জ্বালানি অডিট অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. নিজাম খান ২০৮ পৃষ্ঠার এই অডিট ইন্সপেকশন রিপোর্ট ইস্যু করেন। অডিট কর্তৃপক্ষের কাছে প্রাথমিকভাবে উত্থাপিত ৪৫টি অডিট মেমোর বিপরীতে প্রমাণকের ভিত্তিতে ৪৫টি অনুচ্ছেদ চূড়ান্ত করা হয়েছে, যার মধ্যে ৩৫টি গুরুতর আর্থিক অনিয়ম (এসএফআই) এবং ১০টি সাধারণ অনুচ্ছেদ হিসেবে চিহ্নিত। গুরুতর অনিয়মগুলোর মধ্যে প্রথম অনুচ্ছেদেই সাবসিডিয়ারি কোম্পানি থেকে শেয়ার ডিভিডেন্ড কম আদায় করায় ১১৪ কোটি ১ লাখ ৫ হাজার ১১ টাকার আর্থিক ক্ষতির কথা উল্লেখ রয়েছে। ২০১৩ সালে আশুগঞ্জ পাওয়ার স্টেশন কোম্পানি (এপিএসসিএল), ইউনাইটেড এন্টারপ্রাইজ অ্যান্ড কোম্পানি লিমিটেড এবং ইউনাইটেড আশুগঞ্জ এনার্জি লিমিটেডের (ইউএ-ইএল) মধ্যে শেয়ার পারচেজ এগ্রিমেন্ট স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তি অনুযায়ী এপিএসসিএল ২৯ শতাংশ শেয়ারের মালিকানা লাভ করলেও ইউনাইটেড তাদের ঘোষিত ডিভিডেন্ডের মাত্র ৭.৫৯৩ শতাংশ শেয়ার অনুপাতে লভ্যাংশ প্রদান করে। এছাড়া কোম্পানির ৬৪ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন অবসরপ্রাপ্ত ইউনিট ১ ও ২ বিক্রয়ের সময় স্যালভেজ ভ্যালু থেকে অস্বাভাবিক কম মূল্য হিসাব করায় ৪২ কোটি ৬০ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। ৪৫০ মেগাওয়াট সিসিপিপি (ইস্ট) বিদ্যুৎ কেন্দ্রটিতে ডিফেক্ট লায়াবিলিটি পিরিয়ড শেষ হওয়ার আগেই যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দেয় এবং ২০২৩ সালের মে মাসে কেন্দ্রটি ফোর্স শাটডাউন করা হয়। এই ত্রুটি সংশোধনে ইপিসি ঠিকাদার থেকে অর্থ আদায় না করে কোম্পানির তহবিল থেকে ১০৯ কোটি ৬২ লাখ ৪৯ হাজার টাকা ব্যয় করা হয়েছে। পটুয়াখালী ১৩২০ মেগাওয়াট সুপার থার্মাল পাওয়ার প্লান্টের ভূমি অধিগ্রহণ ও উন্নয়ন প্রকল্পে বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান না হওয়া সত্ত্বেও ঠিকাদারের সঙ্গে ডিপিএম পদ্ধতিতে চুক্তি করে ৩৯০ কোটি ৭৮ লাখ ৭২ হাজার ১১৮ টাকা অনিয়মিত ব্যয় করা হয়েছে। এছাড়া ডিফেক্ট লায়াবিলিটি পিরিয়ডের মধ্যে প্লান্টের আউটেজ আওয়ার চুক্তির শর্তের চেয়ে বেশি হওয়া সত্ত্বেও ক্ষতিপূরণ আদায় না করায় ১১১ কোটি ৫৯ লাখ ৭২ হাজার ৭৪১ টাকার ক্ষতি হয়েছে। প্লান্টের অ্যানুয়েল ডিপেন্ডেবল ক্যাপাসিটি কম ঘোষণা করায় রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে ৮ কোটি ৮৩ লাখ ১৩ হাজার ৬৪৯ টাকা এবং অতিরিক্ত আউটেজের কারণে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় রাজস্ব আয়জনিত ক্ষতি হয়েছে ৬৯৮ কোটি ৯২ লাখ ৪ হাজার ৭৪০ টাকা। অডিট রিপোর্টে আরও দেখা যায়, চাহিদা ছাড়া অতিরিক্ত গ্যাস বুস্টার কম্প্রেসার ক্রয় করায় ৫৪ কোটি ৬৮ লাখ ৮৭ হাজার ৩৭১ টাকার ক্ষতি হয়েছে। বিপিডিবি’র কাছে বিদ্যুৎ বিক্রয় বাবদ বকেয়া নির্ধারিত সময়ে আদায় না করায় ৫ হাজার ৬৬০ কোটি ২৯ লাখ ২৭ হাজার ২৪৮ টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। এছাড়া গ্যাস কনসাম্পশন অনুসারে বিল না করে বিপিডিবি থেকে নির্ধারিত হিট রেট অনুসারে গ্যাস বিল আদায় করায় ৬৩ কোটি ৮১ লাখ ৩৫ হাজার ৬২০ টাকার ক্ষতি হয়েছে। পটুয়াখালী প্রকল্পে ঠিকাদারের কাছ থেকে বিলম্ব জরিমানা (এলডি) কর্তন না করে বিল পরিশোধ করায় ৩৮ কোটি ৬৪ লাখ ২৯ হাজার ৪৯২ টাকা এবং সরকারের শেয়ার মালিকানা বাবদ ঘোষিত ডিভিডেন্ড পরিশোধ না করায় ৩ কোটি ৮ লাখ ৪৯ হাজার ৬৪৫ টাকার ক্ষতি হয়েছে। পুনর্বাসনের নিমিত্তে নির্মিত ঘরের ছাদে প্যাটেন স্টোন ও জানালার থাই গ্লাসের কাজ না করেও ঠিকাদারকে বিল পরিশোধ করায় ২ কোটি ২৯ লাখ ১৭ হাজার ২২৮ টাকা এবং পিপিএ শর্তানুযায়ী বীমা না করায় প্রিমিয়াম ও ভ্যাট বাবদ ১৪ কোটি ৭৯ লাখ ১০ হাজার ১২৫ টাকার ক্ষতি হয়েছে। অর্থ বিভাগের ছাড়পত্র ব্যতীত ডিপিপি প্রণয়ন না করে ২ কোটি ৭৯ লাখ ৯৪ হাজার ৪৫৯ টাকা ব্যয়, প্লান্ট বন্ধ থাকা সত্ত্বেও কর্মচারীদের ওভারটাইম প্রদান বাবদ ১ কোটি ৬১ লাখ ৩১ হাজার ১৭ টাকা এবং আবাসিক গ্রাহকদের বিদ্যুৎ বিল কোম্পানির তহবিল থেকে পরিশোধ করায় ৯ কোটি ৪৮ লাখ ৪৪ হাজার ৮২৭ টাকার অনিয়মিত ব্যয় হয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন কর্মকর্তাকে প্রদত্ত সাময়িক আগাম সমন্বয় না করায় ৭ কোটি ৯২ লাখ ৮০ হাজার ৯৮১ টাকা, দাপ্তরিক প্রাক্কলিত ব্যয় কমিটি গঠন না করে দরপত্র প্রস্তুত করায় ৯৬ কোটি ৪৭ লাখ ৬১ হাজার ৯৯১ টাকা, অবসর ঘোষিত প্লান্টের জন্য মালামাল ক্রয় করায় ২০ কোটি ৬২ লাখ ৮০ হাজার ৪৭৫ টাকা এবং অত্যধিক নিম্নদরে কার্যাদেশ প্রদান করায় ৩ কোটি ৬৫ লাখ ৪৬ হাজার ৮৮২ টাকার অনিয়মিত ব্যয় হয়েছে। প্রতিবেদনের সার সংক্ষেপে বলা হয়, ডিফেক্ট সার্ভিস লায়াবিলিটি পিরিয়ডের মধ্যে যান্ত্রিক ত্রুটি সত্ত্বেও পিজি বাজেয়াপ্ত না করায় ১৪৮ কোটি ৪৬ লাখ ৬৮ হাজার ৮৯১ টাকা, নিলামে সর্বোচ্চ দরদাতাকে বিক্রয়াদেশ না দেয়ায় ২৪ কোটি ৪৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা এবং বিলম্ব জরিমানা আদায় না করায় ১ কোটি ৮৭ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। আউটসোর্সিং কর্মচারীদের বেতন ঠিকাদারকে পরিশোধ করায় ৭ কোটি ৩২ লাখ ৩২ হাজার ৭১৫ টাকা, ঢাকাস্থ অফিসের জন্য অতিরিক্ত ভাড়া বাবদ ১৬ লাখ ৬৫ হাজার ৯৬৬ টাকা, প্রাধিকারের অতিরিক্ত জ্বালানি ব্যবহার বাবদ ৩১ লাখ ৭০ হাজার ৪৪০ টাকা এবং ‘কাজ নাই মজুরি নাই’ ভিত্তিতে জনবল নিয়োগে ৭ কোটি ২০ লাখ ৩৯ হাজার ৩২৯ টাকার অনিয়মিত ব্যয় হয়েছে। পটুয়াখালী প্রকল্পে আরডিপিপি মোতাবেক কাজ না করেই সমাপ্তি ঘোষণা, মালামাল সরবরাহ না করেও ২২ লাখ ৮১ হাজার ৫৪৯ টাকা বিল পরিশোধ এবং বিভিন্ন প্লান্টের মালামাল গৃহীত না হওয়া সত্ত্বেও ৮৪ কোটি ৮৪ লাখ ৬৮ হাজার ৩৫৪ টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। এছাড়া সিপিএফ-এ অতিরিক্ত কন্ট্রিবিউশন প্রদান বাবদ ২ কোটি ৭৫ লাখ ৭৯ হাজার ৯৪৮ টাকা এবং কম বাসা ভাড়া আদায় করায় ১ কোটি ২৩ লাখ ৯৮ হাজার ৪০০ টাকার ক্ষতি হয়েছে। সাধারণ অনিয়মের মধ্যে পটুয়াখালী প্রকল্পে ফিজিবিলিটি স্টাডি ছাড়া ডিপিপি প্রণয়নে ৬৩৭ কোটি ২ লাখ ৬৩ হাজার টাকা ব্যয়, জেনারেশন চালু না রাখায় ৮২ কোটি ১৯ লাখ টাকা ক্ষতি, অব্যবহৃত গ্যাস বুস্টার কম্প্রেসার হিসাবভুক্ত না করায় ৫৪ কোটি ৬১ লাখ ৮৭ হাজার ৩৭১ টাকা এবং উৎপাদন সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও কম বিদ্যুৎ উৎপাদন করায় ৮ হাজার ৬৮৬ কোটি ৬২ লাখ ৪৬ হাজার ৬২৭ টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। এছাড়া জমি বেদখল, পিপিআর ২০০৮ লঙ্ঘন করে আরএফকিউ পদ্ধতিতে অতিরিক্ত ব্যয়, তৃতীয় পক্ষকে জমি লিজ প্রদান বাবদ ৩০ কোটি ৪০ লাখ ৫০ হাজার টাকার অনিয়মিত চুক্তি, ভাড়াকৃত গাড়ি ব্যবহার বাবদ ২ কোটি ৫৪ লাখ ৮০ হাজার ৮০ টাকা এবং বাসা ভাড়া বাবদ ১ কোটি ৮৪ লাখ ১৫ হাজার ৮০৫ টাকার ক্ষতি হয়েছে। এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালকের অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা বিদ্যুৎ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো. সানাউল হক এবং নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ মোশারফ হোসেন খানের সাথে যোগাযোগ করা হলেও সাড়া পাওয়া যায়নি। তবে কোম্পানির পরিচালনা পরিষদের চেয়ারম্যান এবং বিদ্যুৎ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (প্রশাসন) মো. সবুর হোসেন বলেন, অডিট রিপোর্টে কি আছে আমি দেখিনি। তবে ইউনাইটেড পাওয়ারের শেয়ার সংক্রান্ত বিষয়টি আমার নলেজে আছে। তিনি আরও বলেন, আমার পলিসি হলো আমি কোনো ঘুষ নেবো না, দুর্নীতি করবো না। অনিয়ম বা দুর্নীতির তথ্য থাকলে আপনারা তা লিখতে পারেন, এতে আমাদের এসব লোককে ধরতে সুবিধা হবে। কোম্পানির ২০২২-২০২৩, ২০২৩-২০২৪ এবং ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরের হিসাব সম্পর্কিত কমপ্লায়েন্স অডিট কার্যক্রম সম্পন্ন হয় গত বছরের ২৪শে আগস্ট থেকে ২৫শে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। এ বছরের ১৪ই জানুয়ারি বিদ্যুৎ ও জ্বালানি অডিট অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. নিজাম খান ২০২২-২০২৩ থেকে ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরের হিসাব সম্পর্কিত কমপ্লায়েন্স অডিট ইন্সপেকশন রিপোর্ট ইস্যু করেন। কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালককে দেয়া অডিট রিপোর্ট ইস্যুকরণ চিঠিতে বলা হয়, প্রাথমিকভাবে উত্থাপিত ৪৫টি অডিট মেমোর বিপরীতে অডিট কর্তৃপক্ষের জবাব ও প্রমাণকের ভিত্তিতে মোট ৪৫টি অনুচ্ছেদে রূপান্তর করা হয়। যার মধ্যে অনুচ্ছেদ ১ থেকে ৩৫ পর্যন্ত মোট ৩৫টি অনুচ্ছেদকে গুরুতর আর্থিক অনিয়ম (এসএফআই) এবং অনুচ্ছেদ নম্বর ৩৬ থেকে ৪৫ পর্যন্ত মোট ১০টি অনুচ্ছেদকে সাধারণ অনুচ্ছেদ (নন-এসএফআই) হিসেবে চিহ্নিত করে চূড়ান্ত অডিট ইন্সপেকশন রিপোর্ট প্রণয়ন করা হয়েছে। প্লান্টের উৎপাদন সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও কম বিদ্যুৎ উৎপাদন করায় কোম্পানির আর্থিক ক্ষতি ৮৬৮৬ কোটি ৬২ লাখ ৪৬ হাজার ৬২৭ টাকা। তদারকির অভাবে কোম্পানির জন্য বরাদ্দকৃত জমিতে অনিয়মিতভাবে বহিরাগত প্রতিষ্ঠানের তেলের ডিপো নির্মাণ করে ভূমি বেদখল করা হয়েছে। পিপিআর, ২০০৮-এর শর্ত পরিপালন না করে আরএফকিই পদ্ধতিতে নির্ধারিত বাৎসরিক সিলিং সীমার অতিরিক্ত অনিয়মিত ব্যয় ব্যয় ১ কোটি ১৬ লাখ ১৯ হাজার ৭১৮ টাকা। SHARES অর্থনীতি বিষয়: অডিট রিপোর্টআর্থিক অনিয়মআশুগঞ্জ পাওয়ার স্টেশনদুর্নীতিবিদ্যুৎ খাত