কাগজে-কলমে কমছে মূল্যস্ফীতি, তবে বাজারে নেই স্বস্তি প্রকাশিত: ১২:০৫ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ১৯, ২০২৬ সরকারি পরিসংখ্যানের খাতায় মূল্যস্ফীতি সামান্য কমার স্বস্তিদায়ক খবর মিললেও সাধারণ মানুষের বাস্তব জীবনে এর কোনো প্রতিফলন নেই। বিশ্ববাজারে খাদ্যপণ্যের দাম যে হারে বাড়ছে, দেশের বাজারে তার চেয়ে বহুগুণ বেশি দরে পকেট কাটছে সাধারণ মানুষের। জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকটের ঘূর্ণাবর্তে পিষ্ট সীমিত আয়ের মানুষের আয় বাড়ার হার আটকে আছে ৮ শতাংশের ঘরেই। অথচ জীবনযাত্রার ব্যয় হু-হু করে চড়ে বসায় নিম্ন ও মধ্যবিত্তের জীবন এখন একপ্রকার মানবেতর। পরিসংখ্যানের নিম্নমুখী গ্রাফ আর বাজারের ঊর্ধ্বমুখী উত্তাপের এই চড়াই-উতরাইয়ের মাঝে সাধারণ ভোক্তার অবস্থা এখন ত্রাহি। অর্থনীতিবিদদের মতে, কাগজে-কলমে মূল্যস্ফীতি সামান্য কমলেও সাধারণ মানুষের বাজারের বাস্তব অভিজ্ঞতায় কোনো স্বস্তি নেই। জীবনযাত্রার উচ্চ ব্যয় এবং অভ্যন্তরীণ বাজারের নানা দুর্বলতা মানুষের জীবনমান ও পুষ্টির ওপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। বাজারে স্বস্তি ফেরাতে তাঁরা নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা, খাদ্যের সরবরাহ ও মজুতদারি কঠোরভাবে নজরদারি করা, শুল্ক যৌক্তিক করা এবং দরিদ্র মানুষের জন্য সহায়তা কর্মসূচি বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন। ইনস্টিটিউট ফর ইনক্লুসিভ ফাইন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইএনএম) নির্বাহী পরিচালক ড. মোস্তফা কে মুজেরী এ প্রসঙ্গে বলেন, মূল্যস্ফীতির হিসাব মূলত নির্দিষ্ট সময়ের ব্যবধান বা বিন্দুভিত্তিক তুলনার ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়। নিত্যপণ্যের দাম পরিবর্তনের বিষয়গুলো মাথায় রেখেই মূল্যস্ফীতি পরিমাপ করা হয়। তবে সরকারি হিসাবে মূল্যস্ফীতি কমতির দিকে দেখানো হলেও বাজারে এখনো মূল্যস্তর অত্যন্ত উচ্চপর্যায়ে রয়েছে, যা সাধারণ মানুষের জন্য মোটেও স্বাভাবিক পরিস্থিতি নয়। তাঁর মতে, মূল্যস্ফীতির হার কিছুটা কমেছে বলা হলেও বাজারের প্রকৃত পরিস্থিতিতে তেমন কোনো পরিবর্তন হয়নি, মানুষ এখনো চাপেই আছেন। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের আগস্টে সার্বিক মূল্যস্ফীতি শূন্য দশমিক ০৬ শতাংশীয় পয়েন্ট কমে দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ২৬ শতাংশে, যা জুলাইয়ে ছিল ৮ দশমিক ৩২ শতাংশ। গত বছরের আগস্টে এটি ছিল ৮ দশমিক ২৯ শতাংশ। সে হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে মূল্যস্ফীতি কমেছে শূন্য দশমিক ০৩ শতাংশীয় পয়েন্ট। মূল্যস্ফীতি কমার পেছনে প্রধান ভূমিকা রেখেছে খাদ্যপণ্যের দাম। আগস্টে খাদ্য মূল্যস্ফীতি কমে হয়েছে ৭ দশমিক ০২ শতাংশ, যা জুলাইয়ে ছিল ৭ দশমিক ১৬ শতাংশ এবং গত বছরের আগস্টে ছিল ৭ দশমিক ৬০ শতাংশ। তবে খাদ্যবহির্ভূত পণ্য খাতে মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ৩২ শতাংশে, যা জুলাইয়ে ছিল ৯ দশমিক ২৮ শতাংশ এবং গত বছরের একই সময়ে ছিল ৮ দশমিক ৯০ শতাংশ। অঞ্চলভেদে বিবিএসের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, আগস্টে গ্রামাঞ্চলে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৩১ শতাংশ, যা জুলাইয়ে ছিল ৮ দশমিক ৩৬ শতাংশ। গ্রামে খাদ্য মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৭ দশমিক ০১ শতাংশ এবং খাদ্যবহির্ভূত খাতে ৯ দশমিক ৫৯ শতাংশ। অন্যদিকে শহরাঞ্চলে আগস্টে সার্বিক মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ২০ শতাংশে, যা জুলাইয়ে ছিল ৮ দশমিক ২৪ শতাংশ। এ সময়ে শহরে খাদ্য মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৭ দশমিক ০৪ শতাংশ এবং খাদ্যবহির্ভূত খাতে ৮ দশমিক y৭ শতাংশ। মূল্যস্ফীতি সামান্য কমলেও আগস্টে দেশের মানুষের মজুরি বৃদ্ধির হারও কমেছে। বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, আগস্টে জাতীয় পর্যায়ে মজুরি হার সূচকের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৮ দশমিক ০৫ শতাংশ, যা জুলাইয়ে ছিল ৮ দশমিক ২২ শতাংশ এবং গত বছরের একই সময়ে ছিল ৮ দশমিক ১৫ শতাংশ। অর্থাৎ আগস্টে মজুরি বৃদ্ধির হার মূল্যস্ফীতির চেয়ে ছিল শূন্য দশমিক ২১ শতাংশীয় পয়েন্ট কম। ফলে গড় হিসাবে মানুষের আয় বৃদ্ধির তুলনায় জীবনযাত্রার ব্যয় এখনো বেশি হারে বাড়ছে। খাতভেদে আগস্টে কৃষিতে মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৮ দশমিক ০৭ শতাংশ, শিল্পে ৭ দশমিক ৯৭ শতাংশ এবং সেবা খাতে ৮ দশমিক ২৫ শতাংশ। দীর্ঘদিনের উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের পরিবারগুলো খাদ্য, শিক্ষা ও চিকিৎসা ব্যয় কমাতে বাধ্য হচ্ছে, সঞ্চয় ভাঙছে এবং ঋণ নিচ্ছে। বিবিএসের ন্যাশনাল অ্যাকাউন্টিং উইং প্রতিমাসে দেশের ৬৪ জেলা থেকে ১৫৪টি নিত্যপণ্যের হাট-বাজার থেকে তথ্য সংগ্রহ করে। পরে নির্ধারিত দরছকের মাধ্যমে প্রায় ৬৩ ধরনের মজুরি সংক্রান্ত উপাত্ত সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করে এই মজুরি হার সূচক প্রণয়ন করে থাকে। এদিকে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) আগস্টের খাদ্যমূল্য সূচক বিশ্লেষণে দেখা যায়, আন্তর্জাতিক বাজারে খাদ্যপণ্যের সামগ্রিক দাম জুলাইয়ের তুলনায় ১ দশমিক ৯ শতাংশ এবং এক বছর আগের তুলনায় ২ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়েছে। জলবায়ু পরিবর্তন, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় এল নিনোর সম্ভাব্য প্রভাব এবং যুদ্ধের কারণে বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় জটিলতা তৈরি হওয়ায় আগস্টে খাদ্যশস্য, ভোজ্যতেল, মাংস, দুগ্ধপণ্য ও চিনিসহ পাঁচটি প্রধান পণ্যগোষ্ঠীর দামই বেড়েছে। তবে বিশ্ববাজারে যে হারে খাদ্যপণ্যের দাম বেড়েছে, তার চেয়ে অনেক বেশি বেড়েছে বাংলাদেশে। বিশ্লেষকদের মতে, দেশের খুচরা দামের ওপর আমদানি মূল্য, ডলারের বিনিময় হার, জাহাজভাড়া, শুল্ক-কর ও ব্যবসায়িক ব্যয়ের প্রভাব রয়েছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে দাম সামান্য বাড়লেও দেশের বাজারে তা অস্বাভাবিক রূপ নেয়। যেমন, দেশে পোলাওর চাল বা চিনিগুঁড়া চালের দাম দুই থেকে তিন মাসে ১৪০ থেকে ১৫০ টাকা থেকে বেড়ে ২৩০ থেকে ২৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। একইভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে ভোজ্যতেলের দাম বাড়ার অজুহাতে সম্প্রতি সরকার বোতলজাত সয়াবিন তেলের সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য লিটারপ্রতি ১৯৯ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০৪ টাকা করেছে। ব্যবসায়ীরা আরো বেশি বাড়ানোর দাবি করলেও বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশন (বিটিটিসি) লিটারপ্রতি ১০ টাকা বাড়ানোর সুপারিশ করেছিল। এছাড়া এফএওর তথ্যমতে, গমের আন্তর্জাতিক বাজারে দাম গত এক মাসে ২ দশমিক ৬ শতাংশ বেড়েছে এবং এক বছর আগের তুলনায় তা প্রায় ১৫ শতাংশ বেশি। কিন্তু দেশের বাজারে গত জুন-জুলাইয়ে প্রতি কেজি আটা ৬০ টাকা থাকলেও বর্তমানে তা বেড়ে হয়েছে ৬৫ টাকা (৮.৩ শতাংশ বৃদ্ধি) এবং প্রতি কেজি ময়দা ৭০ টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ৮০ টাকা (১৪.৩ শতাংশ বৃদ্ধি)। অর্থনীতিবিদদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধির তুলনায় দেশে পণ্যের দাম বেশি বাড়ার পেছনে আমদানি ব্যয়ের পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ বাজারের দুর্বলতাও দায়ী। সরবরাহ ঘাটতি, অতিরিক্ত মধ্যস্বত্বভোগী, মজুতদারি, দুর্বল তদারকি এবং সীমিত প্রতিযোগিতার কারণে পণ্যের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। বিশেষ করে চিনিগুঁড়া চালের মতো পণ্যে মৌসুমি চাহিদা ও সরবরাহ নিয়ন্ত্রণের সুযোগ নিয়ে অসাধু চক্র অতিরিক্ত মুনাফা করে। এই পরিস্থিতিতে বাজার নিয়ন্ত্রণ ও স্বস্তি ফেরাতে শুল্ক যৌক্তিক করার পাশাপাশি দরিদ্র মানুষের জন্য লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা আরো সম্প্রসারণ করা অত্যন্ত জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। অপরদিকে চলতি বছর বিশ্ববাজারে খাদ্যপণ্যের দাম চড়া। মূল্যবৃদ্ধির হার ২০২২ সালের পর সবচেয়ে বেশি এখন। জলবায়ু পরিবর্তন ও যুদ্ধের কারণে সরবরাহ ব্যবস্থায় জটিলতা তৈরি হওয়ায় আগস্টে খাদ্যপণ্যের দাম বেড়েছে বলে জানিয়েছে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও)। তবে বিশ্ববাজারে যে হারে খাদ্যপণ্যের দাম বেড়েছে তার চেয়ে অনেক বেশি বেড়েছে বাংলাদেশে। যদিও বাজার বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের খুচরা দামের মধ্যে আমদানি মূল্য, ডলারের বিনিময় হার, জাহাজভাড়া, পরিশোধন, পরিবহন, শুল্ক-কর ও ব্যবসায়িক ব্যয়সহ একাধিক উপাদানের ওপর ভিত্তি করেই হয়ে থাকে। SHARES অর্থনীতি বিষয়: অর্থনীতিনিত্যপণ্যবাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোবাজার-দরভোক্তা ভোগান্তিমূল্যস্ফীতি