ঢাকার গণপরিবহনে শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি

প্রকাশিত: 9:31 AM, August 3, 2026

রাজধানী ঢাকা বিশ্বের অন্যতম ধীরগতির শহর। যানজটের কারণে এখানে বাসের গড় গতি অনেক সময় ঘণ্টায় ৯ দশমিক ৭ কিলোমিটারে নেমে আসে, আবার ব্যস্ত সময়ে তা ৫ থেকে ৭ কিলোমিটারে পৌঁছায়। বুয়েটের কয়েক বছর আগের গবেষণা অনুযায়ী, ঢাকার সড়কে যানবাহনের গড় গতি অনেকটা মানুষের হাঁটার গতির সমান। এমন স্থবির নগরীতে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর উচ্চহার এক গভীর বৈপরীত্য তৈরি করেছে। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের সর্বশেষ পরিসংখ্যানে এই চিত্র আরও ভয়াবহভাবে ফুটে উঠেছে। ২০২০ সাল থেকে চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত রাজধানীতে ১ হাজার ৮৪৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় ১ হাজার ৩৮৪ জন প্রাণ হারিয়েছেন এবং আহত হয়েছেন ২ হাজার ৪৮৮ জন। উদ্বেগের বিষয় হলো, নিহতদের প্রায় ৮২ শতাংশই পথচারী ও মোটরসাইকেল আরোহী; যার মধ্যে ৫৯২ জন পথচারী এবং ৫৩৬ জন মোটরসাইকেল আরোহী। এই পরিসংখ্যান শুধু দুর্ঘটনার নয়, এটি নগর পরিকল্পনা, পরিবহনব্যবস্থা এবং সড়ক ব্যবস্থাপনার দীর্ঘদিনের ব্যর্থতারও প্রতিচ্ছবি।

দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে রাত সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ সময় হিসেবে চিহ্নিত, যেখানে মোট মৃত্যুর ৩৭ দশমিক ৫ শতাংশই রাতে ঘটে। এরপরই রয়েছে সকালের সময়। যাত্রাবাড়ী, ডেমরা, মোহাম্মদপুর, কুড়িল বিশ্বরোড ও বিমানবন্দর এলাকাকে দুর্ঘটনার হটস্পট হিসেবে দেখা হচ্ছে। রাতে ভারী মালবাহী যানবাহনের বেপরোয়া চলাচল এবং ফাঁকা সড়কে অতিরিক্ত গতির প্রবণতা পথচারীদের জন্য ভয়াবহ ঝুঁকি তৈরি করছে। দিনের বেলায় দীর্ঘ যানজটের কারণে চালকদের ধৈর্যচ্যুতি ও আক্রমণাত্মক আচরণ দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ হয়ে উঠছে। সিগন্যাল ছাড়ার পর অনেক চালক বেপরোয়া হয়ে ওঠেন। এছাড়া বাসে যাত্রী তোলার প্রতিযোগিতা, রুটে আধিপত্য বিস্তার এবং নিয়ন্ত্রণহীন প্রতিযোগিতাও দুর্ঘটনা বাড়ায়। এগুলো কোনো অনিবার্য বাস্তবতা নয়, বরং দুর্বল ব্যবস্থাপনা ও জবাবদিহির ফল।

বুয়েটের অধ্যাপক ও পরিবহন বিশেষজ্ঞ মো. হাদীউজ্জামানের মতে, ঢাকায় এতদিন বিনিয়োগ হয়েছে মূলত যানবাহনের জন্য, পথচারীদের জন্য নয়। অথচ শহরের প্রায় ৩০ শতাংশ মানুষ হেঁটেই গন্তব্যে পৌঁছান। এই বক্তব্য নগর উন্নয়নের মৌলিক সমস্যা সামনে আনে। উড়ালসড়ক, এক্সপ্রেসওয়ে বা নতুন সড়ক নির্মাণের চেয়ে নিরাপদ ফুটপাত, কার্যকর জেব্রা ক্রসিং, পর্যাপ্ত পদচারী-সেতু, সিগন্যালনির্ভর নিরাপদ পারাপার এবং প্রতিবন্ধীবান্ধব অবকাঠামো নিশ্চিত করা কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। গণপরিবহনের দুরবস্থার কারণেই মানুষ মোটরসাইকেলের ওপর অতিনির্ভরশীল হয়ে পড়ছে, যা নিরাপত্তাঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে।

পরিবহন খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে রুট রেশনালাইজেশনের মাধ্যমে কোম্পানিভিত্তিক বাস পরিচালনা এবং বিআরটিএ, বিআরটিসি, ডিটিসিএ, সিটি করপোরেশন ও ট্রাফিক পুলিশের সমন্বিত উদ্যোগ অপরিহার্য। এই সুপারিশগুলো নতুন নয়, কিন্তু বাস্তবায়নের অভাবই সবচেয়ে বড় সংকট। কেবল আইন প্রয়োগ বা জরিমানা বাড়িয়ে দুর্ঘটনা কমানো সম্ভব নয়; বরং গণপরিবহনকে নির্ভরযোগ্য, সময়নিষ্ঠ, নিরাপদ ও আরামদায়ক করে গড়ে তুলতে হবে। চালকদের প্রশিক্ষণ ও কর্মঘণ্টার সুনির্দিষ্ট নীতিমালা এবং যাত্রীবান্ধব বাসব্যবস্থা গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি। রাজধানীর ধীরগতির সড়কে দ্রুত মৃত্যুর মিছিল থামাতে হলে মানুষকেন্দ্রিক নগর পরিকল্পনা, পথচারীবান্ধব অবকাঠামো এবং আধুনিক, শৃঙ্খলাবদ্ধ গণপরিবহনব্যবস্থা গড়ে তোলার বিকল্প নেই।